ডুমুরিয়ার বিল ডাকাতিয়ায় জলাবদ্ধঃ মৎস্য- কৃষি খাতে ক্ষতি শত কোটি টাকা
- আপডেট সময় : ১০:৪৪:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ অক্টোবর ২০২৪ ২০৬ বার পঠিত

এক সময়ে খুলনার বিল ডাকাতিয়া কৃষিজীবী মানুষের আশীর্বাদ ছিল। এ বিলে ধান, সবজি ও মাছ উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন এ অঞ্চলের অধিকাংশ বাসিন্দারা।
জলামগ্ন বিল ডাকাতিয়ায় এখন তা আর সম্ভব হচ্ছে না। সাম্প্রতিক কয়েকদিনের একটানা অতিরিক্ত ভারী বর্ষণে, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে তলিয়ে গেছে এ বিলের অন্তত সোয়া তিন হাজার হেক্টর জমির ৮ হাজার ২৫০ টি মাছের ঘের, কয়েক হাজার ক্ষেতের ফসল,তলিয়েছে বসতবাড়ি রাস্তাঘাট।
সবমিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকার উপরে।
পরিস্থিতি এমন যে, বিল ডাকাতিয়া এখন এ অঞ্চলের মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচতে স্থায়ী সমাধানের দাবি এখানকার মানুষের।
স্থানীয়রা জানান, বিল ডাকাতিয়ার পানি নিষ্কাশনে সংযুক্ত হরি নদী, হামকুড়া নদী ও ভদ্রা নদী পুরোপুরি ভরাট হয়ে গেছে। ফলে এখানকার বর্ষার পানি বের হতে না পেরে সারা বছর ধরেই জলাবদ্ধতা থাকে। ডুমুরিয়ার শোলমারী নদী দিয়ে এই অঞ্চলের কিছু পানি নিষ্কাশন হলেও পলি পড়ে তাও ব্যাহত হচ্ছে।
জানা গেছে,দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিলটি হলো বিল ডাকাতিয়া। খুলনার ফুলতলা ও ডুমুরিয়া এবং যশোর জেলার অভয়নগর ও কেশবপুর উপজেলা নিয়ে বিল ডাকাতিয়ার বিস্তৃতি।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার অংশের বিল ডাকাতিয়ার প্রান্তিক মাছচাষিরা।অধিকাংশ মাছ ভেসে যাওয়ায় মাছ চাষিদের বিপাকে পড়তে হয়েছে বিল ডাকাতিয়ার মাছ চাষিদের।
তেলিগাতী গ্রামের অন্যতম মাছ চাষি মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা এখানে যারা মাছ চাষের ওপর নির্ভরশীল, আমরা সবাই পানিতে প্লাবিত। অনেক ক্ষতি হইছে। হাজার হাজার হেক্টর জমির মাছ পানিতে ভেসে গেছে।আমরা এখন সব হারিয়ে এক প্রকার নিঃস্ব হয়ে পড়েছি।
এছাড়াও অধিকাংশ মাছচাষিরা দৈনিক খোলা কাগজকে জানাই এ বছর বিল ডাকাতিয়ায় আমরা যারা মাছচাষ করেছি আমাদের কপাল খুবই খারাপ। এতই খারাপ যে আমরা আর সোজা হয়ে দাড়াতে পারবো না।আমাদের অনেকেরই আছে শত শত হেক্টর মাছের ঘের। অধিকাংশ ঘের পানিতে ভেসে গেছে।দুই একটি মাছের ঘের কোনো রকম জেগে আছে তাও সেটা নেট দিয়ে রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে।
রংপুর গ্রামের দীপক সরকার বলেন, ডাকাতিয়ার বিলের মানুষ, আমরা বড় কষ্টে আছি। আমরা মানবেতর জীবন যাপন করছি। অতি বৃষ্টির কারণে বিল ডাকাতিয়ার ৯৯% মাছের ঘের তলিয়ে শতকোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে।এলাকার মাছ চাষিদের দুশ্চিন্তায় আছে কি ভাবে এ ক্ষতি পূরণ হবে।
উপজেলার রংপুর গ্রামের বাসিন্দা লিটন শেখ বলেন
বিল ডাকাতিয়ার চারদিকে শুধু পানি আর পানি। পানি নিষ্কাসনের খালগুলো সব বন্ধ হয়ে আছে। কী করব, ভেবে কুল কিনারা পাচ্ছি না। সরকারি ভাবে সাহায্য সহযোগিতা তো দুরে থাক আমাদের খোঁজখবর তো এখনও পর্যন্ত নেইনি।।
ডুমুরিয়া উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ আবু বক্কর সিদ্দিকী আমাদের প্রতিবেদককে বলেন টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় ডুমুরিয়া উপজেলার অন্তর্ভুক্ত বিল ডাকাতিয়ার ৩ হাজার ৩৬ হেক্টর জমির সাড়ে ৭ হাজার মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিতে ভেসে গেছে ঘেরের মুল্যবান চিংড়ি ও সাদা মাছ।বিল ডাকাতিয়ার ডুমুরিয়া উপজেলার অংশে সবমিলিয়ে মৎস্য খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৫০ কোটি টাকা হবে।
তিনি আরও জানান সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে বিল ডাকাতিয়ায়। শৈলমারি স্লুইসগেট থেকে পানি নিষ্কাসনের জন্য ইতিমধ্যে আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছি। আশা রাখছি অল্প সময়ের মধ্যে শৈলমারি গেইট দিয়ে বিল ডাকাতিয়ার পানি নিষ্কাসন হয়ে যাবে।
একই উপজেলার কৃষি অফিসার কৃষি্িদ ইনসাদ ইবনে আমিন বলেন টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় ডুমুরিয়া উপজেলার অন্তর্ভুক্ত বিল ডাকাতিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা প্রাবিত হয়েছে।কৃষি নির্ভর ডুমুরিয়া উপজেলার অধ্যুষিত রংপুর, গুটুদিয়া,রঘুনাথপুর ও ধামালিয়া ইউনিয়নের ধান এবং সবজি চাষিদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।বিশেষ করে গ্রীস্মকালীন টমেটোর ক্ষতি হয়েছে সব থেকে বেশি।
সবমিলিয়ে ডুমুরিয়া উপজেলার ৫ টি ইউনিয়নের বিল ডাকাতিয়ার অংশে কৃষি খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৩৫ কোটি টাকার মতো।
তিনি আরও বলেন প্রান্তিক কৃষকদের একটাই দাবি তাদের ক্ষেতের পানি সরানোর ব্যাবস্থা করা।
কিন্তু উপজেলা পর্যায়ে সরকারিভাবে কৃষি অফিসে কোনো সেচযন্ত্র সরবরাহ না থাকায় উপজেলা কৃষি অফিস পানি নিষ্কাসন করতে পারছে না।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)কৃষকদের সেচ ব্যাবস্থা নিয়ে কাজ করে থাকে।কিন্তু উপজেলা পর্যায়ে তাদের কোনো অফিস নাই। জেলা পর্যায়ের অফিস থেকে উপজেলা পর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
উপজেণক পর্যায়ে (বিএডিসি)এর কার্যক্রম থাকলে প্রান্তিক কৃষকরা আরও উপকৃত হতেন।
উপজেলা কৃষি অফিস থেকে সেচের মাধ্যমে পানি নিষ্কাসনের ব্যাবস্থা না করতে পারলেও আমরা কৃষি অফিস থেকে প্রান্তিক কৃষকদের ক্ষেতের পানি সরে যাওয়ার পর কৃষি নিয়ে করণীয় সম্পর্কে সর্বক্ষণ পরামর্শ দিয়ে চলেছি।।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) খুলনা অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল ফারুক জানান, বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্পের আওতায় বিল ডাকাতিয়ায় ১৮ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। খাল খননের ফলে শোলমারী স্লুইস গেট দিয়ে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে। তবে নদী ভরাট হওয়ায় নিষ্কাশন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। বিলে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান নিয়ে বাস্তবসম্মত প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।


















