গোয়ালন্দে চারটি মৌজার রেকর্ড সংশোধন ও খাজনা চালুর দাবিতে গণস্বাক্ষর
- আপডেট সময় : ০৭:১০:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৯ মার্চ ২০২৪ ১৪৮ বার পঠিত

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে চারটি মৌজায় সরকারি খাস-খতিয়ানভুক্ত জমির রেকর্ড সংশোধন করে প্রকৃত মালিকদের নামে রেকর্ড জারি ও খাজনা চালুর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
এ উপলক্ষে জমির আরএস রেকর্ডীয় মালিকরা উর্ধতন কতৃপক্ষের নিকট জমা দিতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করছেন।
উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের আওতাভুক্ত পদ্মা নদী দ্বারা মূল ভুখন্ড হতে বিচ্ছিন্ন মৌজা চারটি হলো ৫ নং বেতকা, ৪ নং রাখালগাছি, ৮ নং বড়সিংড়া ও ৯ নং বড়বিল। মৌজা চারটিতে মোট জমির পরিমাণ ১ হাজার ২৪৬.৭৩ একর। খাজনা বন্ধ থাকায় রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
স্হানীয়রা জানান, পদ্মা নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় জেগে ওঠে ওই মৌজাগুলো। এখন সেখানে অনেক পরিবারের বসবাস। চলে চাষাবাদ। মৌজাগুলোকে ঘিরে সেখানে গড়ে উঠেছে জনপদ, হাটবাজার, মসজিদ, আশ্রয়কেন্দ্র, উপ- স্বাস্হ্যকেন্দ্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ইটভাটা প্রভৃতি।
এছাড়া এখনে গড়ে উঠেছে দেবগ্রাম ইউনিয়নের পূর্ণাঙ্গ ১ নং ওয়ার্ডটি। যেখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৯৬৫। মোট জনসংখ্যা প্রায় ৪ হাজার।
স্হানীয় ভূমি অফিস ও ভূমি মালিকরা জানান, ৫ নং বেতকা মৌজায় মোট জমির পরিমাণ ৪৯৮ একর ৮০ শতাংশ, ৪ নং রাখালগাছি মৌজায় মোট জমির পরিমাণ ৬৬১ একর ৩৬ শতাংশ, ৮ নং বড়সিংড়া মৌজায় মোট জমির পরিমাণ ৬৭ একর ৮২ শতাংশ এবং ৯ নং বড়বিলা মৌজায় মোট জমির পরিমাণ ১৮ একর ৭৫ শতাংশ।
বেতকা মৌজার বেশিরভাগ জমি খাস খতিয়ানে থাকলেও এখানে রয়েছে ২১ নং বেতকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেতকা জামে মসজিদ, নবনির্মিত ইটের তৈরি রাস্তাসহ দুই শতাধিক পরিবারের বসবাস।
১৯৪০-৪২ সালে আর এস রেকর্ড অনুযায়ী এই জমির মালিক ছিলেন বেতকার বাসিন্দারা। বেতকা এলাকাটি নদী মাতৃক মৌজা হওয়ায় বারবার নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে ১৯৭৭-৭৮ সালে দিয়ারা রেকর্ডে ৫ নং বেতকা মৌজার ৪৯৮.৮০ একর জমি ১ নং খাস খতিয়ানে চলে যায়। তবে তার মধ্যে ১১.৩২ একর ভূমি প্রজা বা কিছূ মালিকের নামে দিয়ারা রেকর্ড চূড়ান্ত হয়।
আলাপকালে দিয়ারা রেকর্ডের মালিক আফতার ফকির, সামছুল ফকির, ফজলু সরদার, শহিদ সরদার, আনছার আলী, সুফিয়া খাতুনসহ বেশ কয়েকজন জানান, তাদের জমি খাস-খতিয়ান থেকে রেহায় পাই। বাকী জমি সরকারের ১ নম্বর খতিয়ানভুক্ত রয়েছে।
৪ নং রাখালগাছি মৌজার ভূমি দিয়ারা রেকর্ড অনুযায়ী ৬৪৬.৪৩ একর জমি সরকারের ১ নং খাস খতিয়ানে চূড়ান্ত রেকর্ড হয়। তবে উল্লিখিত ভৃমি সাবেক আর এস রেকর্ডীয় মালিকগণ ভোগ দখলে আছেন। এখানে রয়েছে সোনালী সকাল প্রতিবন্ধী স্কুল, রাখালগাছি জামে মসজিদ, আক্তার ইট ভাটা, রাখালগাছি সিএন্ডবি বাজার ও বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। ৮ নং বড় সিংড়া মৌজা আর এস রেকর্ডধারী। মৌজাটির বেশির ভাগ জমি নদী গর্ভে থাকায় এস এ রেকর্ড হয়নি। ১৯৭২-৭৩ সালে মৌজাটির দিয়ারা জরিপ অনুষ্ঠিত হয়। দিয়ারা জরিপে পি.ও ১৩৫/৭২ অধ্যাদেশ বলে মৌজাটির সমস্ত জমি (৯৩.১৯ একর) সরকারের ১ নং খাস খতিয়ান ভুক্ত হয়। তবে বর্তমান আর এস রেকর্ড অনুযায়ী মালিকগণ ভোগ দখলে আছে। সেখানে মালিকগণ বসবাস ও চাষাবাদ করছেন। তাদের দখলি জমিতে পিয়াজ, রসুন, বেগুন, বাদাম, শরিষা, ধান, ভূট্টা প্রভৃতি ফসল উৎপাদন করছেন। ৯ নং বড়বিলা মৌজাটি বছরে ৬ মাস পানিতে থাকে আবার ৬ মাস দখলীকৃত মালিকগণ চাষাবাদ করেন। ১৯৭২-৭৩ সালে মৌজাটির দিয়ারা জরিপ অনুষ্ঠিত হয়। দিয়ারা জরিপে পি.ও ১৩৫/৭২ অধ্যাদেশ বলে সমস্ত জমি (৯৫.৪৩ একর) ১ নং খাস খতিয়ানে নথিভুক্ত হয়। মৌজাটি ১৯৯৫ সালে নদী গর্ভে বিলীন হয় এবং ২০০৩ সালে আবার জেগে উঠলেও বসবাস যোগ্য না হওয়ায় ৬ মাস পানিতে থাকে আবার রেকর্ডীয় মালিকগণ ৬ মাস চাষাবাদ করেন। তবে বর্তমানে চরের কিছু কিছু জায়গাই বসতি গড়ে উঠেছে।
স্হানীয় ভুক্তভোগী ভূমি মালিক মো. রিয়াজ উদ্দিন খান, আক্কাছ কাজী, জসিম উদ্দিন মন্ডল, মো. কাশেম মন্ডল, মো. ইরাদ আলী ঠাকুর, মো. পাথর আলী ঠাকুর, মো. সামাদ মন্ডল, ইউনুছ মৃধা, মো. আকু প্রামানিক, আনোয়ার মেম্বার, মো. মোহন ঠাকুর, মো. ইশারত ঠাকুর, মো. তাহের আলী ঠাকুর, মো. ওসমান মন্ডল, আব্দুর রাজ্জাক মন্ডল, মো. বাহের মন্ডল, আলম মৃধা, মোহন প্রামানিকসহ আরো অনেকে আক্ষেপ নিয়ে বলেন, আমাদের বাপ-দাদা এতোদিন এই জমিতে ভোগদখলে ছিলো এখন আমরা ভোগ দখলে রয়েছি। আমরা আমাদের নিজেদের নামে জমির রেকর্ড জারি এবং খাজনা চালুর দাবি জানাই।
এ সম্পর্কে জমির মালিক ও বেতকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মো. রিয়াজ উদ্দিন খান বলেন, আমাদের জন্ম এই চরে। আমার বাপ-দাদা এই জমিতেই বসবাস ও চাষাবাদ করেছে। এখন আমরা বসবাস ও চাষাবাদ করছি। এলাকাটি নদী-মাতৃক হওয়ায় ভুলক্রমে খাস খতিয়ানে চলে গেছে। দখল ও দাগ অনুযায়ী ভূমি মালিকগণ ভোগ দখলে আছে। আমরা রেকর্ড সংশোধন করে ভূমিকর দিতে প্রস্তুত আছি। সরকার যদি আমাদের রেকর্ড সংশোধন করে যার যার জমির খাজনা দেয়ার সুযোগ করে দেয় তাহলে এই মৌজা থেকে সরকারের ভূমি রাজস্ব খাতে অনেক আয় হবে। তাছাড়া খাজনা চালু না হওয়ায় আমরা প্রয়োজনে এই জমি বেঁচাকেনা, ব্যাংক বা এনজিও সংস্থা হতে লোন নিতে পারছি না।
দেবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ হাফিজুল ইসলাম বলেন, বেতকা ও রাখালগাছি মৌজা ঘিরে পদ্মা নদীর ওপারে দেবগ্রাম ইউনিয়নের পূর্ণাঙ্গ একটি ওয়ার্ড গড়ে উঠেছে। বর্তমানে সেখানে বেশ কয়েক বছর ধরে আরএস রেকর্ডের মালিকরা বসবাস করছেন। কিন্তু সম্পূর্ণ মৌজাগুলো ১ নং খতিয়ানভুক্ত যাওয়ায় মালিকগণ খাজনা দিতে পারছেন না। আমি এ বিষয়ে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি। যাতে মালিকগণ তাদের জমির খাজনা দিতে পারেন।


















