ঢাকা ০৩:৫৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
আলফাডাঙ্গায় নজরুল বর্ষ উপলক্ষে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা শুরু নাগেশ্বরীতে বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেনের মৃত্যু রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন ফরিদপুর‌ পৌরসভার ‌ সাবেক ১ নং ‌ প্যানেল মেয়র মনিরুল ইসলাম মনির গ্রেপ্তার কুষ্টিয়ার সাংবাদিকতার উজ্জ্বল নক্ষত্র প্রবীণ সাংবাদিক নুরুননবী বাবু সালথায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা গ্রেপ্তার দৌলতদিয়ায় পার্কিং করা যাত্রীবাহি বাসে আগুন  নাগেশ্বরীতে ৭ দফা দাবিতে দলিল লেখক সমিতির প্রতিবাদ সভা দেবহাটায় পুলিশের অভিযানে ১জন আসামি গ্রেপ্তার খালের ইজারা বাতিল ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্তের দাবিতে দেবহাটায় মানববন্ধন নওগাঁয় ট্রাক-সিএনজি মুখোমুখি সংঘর্ষে সড়ক বিভাগের প্রকৌশলী নি-হ-ত

বোদায় স্কুলছাত্রী নিখোঁজ ২৬ দিন, প্রধান শিক্ষককে ঘিরে রহস্য

মোঃ মাহমুদুল হাসান বাবু,পঞ্চগড়:
  • আপডেট সময় : ০৮:৪৬:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬ ৫৯ বার পঠিত

খাতা-কলম হাতে আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই গত ২২ জুন সকালে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল ১৪ বছরের কিশোরী তামিনা। পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার নতুনহাট আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর আর বাড়ি ফেরা হয়নি। দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ ২৬টি দিন। আদরের সন্তানকে হারিয়ে যখন একটি পরিবার নিঃস্ব প্রায়, ঠিক তখনই এই নিখোঁজ রহস্যে যোগ হয়েছে এক নতুন ও ভয়ঙ্কর মোড়। অভিযোগের আঙুল খোদ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফজলার রহমানের দিকে।

পরিবারের দাবি এবং স্থানীয়দের ক্ষোভ—সব মিলিয়ে নিখোঁজ তামিনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক ধোঁয়াশাপূর্ণ পরিস্থিতি, যার কেন্দ্রে রয়েছেন খোদ শিক্ষার আলো ছড়ানোর দায়িত্বে থাকা এই প্রধান শিক্ষক।

রহস্যময় সেই ফোন কল ও প্রধান শিক্ষকের ভোলবদল তামিনা নিখোঁজ হওয়ার পর যখন চারদিকে হন্যে হয়ে খোঁজ চলছিল, তার কিছুদিন পর নিখোঁজ ছাত্রীর দাদীর মুঠোফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল আসে। ওপাশ থেকে পরিচয় গোপন করে এক ব্যক্তি জানান,”তাহমিনা ঢাকা ও চট্টগ্রামে ভালো আছে। তাকে আর খোঁজাখুঁজির দরকার নেই।”

শুধু তাই নয়, কিশোরী মেয়েটিকে নিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর ও অসংলগ্ন মন্তব্যও করা হয় সেই কল থেকে। কিন্তু নিখোঁজ তামিনার পরিবার সেই কণ্ঠস্বর চিনতে ভুল করেনি। এটি আর কারও নয়, খোদ স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফজলার রহমানের কণ্ঠ।

পরবর্তীতে পরিবার যখন সরাসরি প্রধান শিক্ষকের মুখোমুখি হয়ে মেয়েকে ফেরত চায়, তখন তিনি সম্পূর্ণ সুর বদলে ফেলেন। মুঠোফোনের কথোপকথন অস্বীকার করার পাশাপাশি উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারটিকে ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

অসহায় পরিবারের আকুতি নিখোঁজ তামিনার দাদী সমিজা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন,
“আমার আদরের নাতনী সারাক্ষণ আমার সাথে থাকতো। ২৬ দিন ধরে ও নাই। ফজলার মাস্টার ১০ দিন পর মোবাইলে ফোন করে ওর খবর দেয়, সাথে অনেক খারাপ কথাও বলে। নাতনীকে ফিরে পাওয়ার জন্য আমি টাকা-পয়সা যা লাগে দিতে চেয়েছি, কিন্তু এখন সে সব অস্বীকার করে আমাদের হুমকি দিচ্ছে। আমি শুধু আমার নাতনীকে ফেরত চাই।”

কান্না থামছে না মা রুনা বেগমেরও। ক্ষোভ আর আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন,”আমরা গরীব মানুষ বলে কি বিচার পাব না? হেডমাস্টার প্রথমে বলল মেয়ে তার কাছে আছে, আবার নানা নোংরা কথা বলল। এখন থানায় জানিয়েও কোনো সুরাহা পাচ্ছি না। কেউ আমাদের মূল্যায়ন করছে না।”

মেয়ের বাবা আলতাবুর রহমান জানান,মেয়েকে উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও কোনো লাভ হয়নি। উল্টো এখন প্রভাবশালী মহলের পক্ষ থেকে নানা মাধ্যমে তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

প্রধান শিক্ষকের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে প্রধান শিক্ষক ফজলার রহমান দাবি করে তিনি বলেন, যে নম্বর থেকে কল করা হয়েছিল সেটি তার নয়, তার চাচার। তবে অডিও রেকর্ডের কণ্ঠের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি দাবি করেন, কেউ হয়তো তার “কণ্ঠ নকল” করে কথা বলেছে! একই সাথে তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে সামাজিকভাবে ফয়সালার চেষ্টা চলছে।

অতীতেও ছাত্রীদের সাথে অনৈতিক সম্পর্কের যে অভিযোগ তার বিরুদ্ধে রয়েছে, তাও তিনি অস্বীকার করেন।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা সামছুল আলমসহ প্রতিবেশীদের দাবি ভিন্ন। তারা জানান,এই প্রধান শিক্ষকের চরিত্র নিয়ে আগেও নানা বিতর্ক ছিল। একজন শিক্ষকের এমন রহস্যজনক ও আপত্তিকর আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

এত বড় একটি ঘটনা ঘটলেও আইনি প্রক্রিয়ার গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বোদা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সোয়েল রানা জানান, এই বিষয়ে থানায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। তবে কিছুদিন আগে মৌখিক তথ্য পাওয়ার পর সহকারী পরিদর্শক (এসআই) তৌহিদ বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।

২৬ দিন ধরে একটি নাবালিকা মেয়ে নিখোঁজ, যার সাথে জড়িয়ে গেছে একজন প্রধান শিক্ষকের নাম—সেখানে লিখিত অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকে কেন প্রশাসন স্বতঃস্ফূর্তভাবে কঠোর তদন্তে নামছে না? কেন এখনো উদ্ধার করা গেল না তামিনাকে?
একটি অসহায় পরিবার তাদের কন্যাসন্তানকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পেতে এখন স্থানীয় প্রশাসন ও উচ্চপদস্থ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছে।

ট্যাগস :

বোদায় স্কুলছাত্রী নিখোঁজ ২৬ দিন, প্রধান শিক্ষককে ঘিরে রহস্য

আপডেট সময় : ০৮:৪৬:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

খাতা-কলম হাতে আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই গত ২২ জুন সকালে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল ১৪ বছরের কিশোরী তামিনা। পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার নতুনহাট আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর আর বাড়ি ফেরা হয়নি। দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ ২৬টি দিন। আদরের সন্তানকে হারিয়ে যখন একটি পরিবার নিঃস্ব প্রায়, ঠিক তখনই এই নিখোঁজ রহস্যে যোগ হয়েছে এক নতুন ও ভয়ঙ্কর মোড়। অভিযোগের আঙুল খোদ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফজলার রহমানের দিকে।

পরিবারের দাবি এবং স্থানীয়দের ক্ষোভ—সব মিলিয়ে নিখোঁজ তামিনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক ধোঁয়াশাপূর্ণ পরিস্থিতি, যার কেন্দ্রে রয়েছেন খোদ শিক্ষার আলো ছড়ানোর দায়িত্বে থাকা এই প্রধান শিক্ষক।

রহস্যময় সেই ফোন কল ও প্রধান শিক্ষকের ভোলবদল তামিনা নিখোঁজ হওয়ার পর যখন চারদিকে হন্যে হয়ে খোঁজ চলছিল, তার কিছুদিন পর নিখোঁজ ছাত্রীর দাদীর মুঠোফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল আসে। ওপাশ থেকে পরিচয় গোপন করে এক ব্যক্তি জানান,”তাহমিনা ঢাকা ও চট্টগ্রামে ভালো আছে। তাকে আর খোঁজাখুঁজির দরকার নেই।”

শুধু তাই নয়, কিশোরী মেয়েটিকে নিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর ও অসংলগ্ন মন্তব্যও করা হয় সেই কল থেকে। কিন্তু নিখোঁজ তামিনার পরিবার সেই কণ্ঠস্বর চিনতে ভুল করেনি। এটি আর কারও নয়, খোদ স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফজলার রহমানের কণ্ঠ।

পরবর্তীতে পরিবার যখন সরাসরি প্রধান শিক্ষকের মুখোমুখি হয়ে মেয়েকে ফেরত চায়, তখন তিনি সম্পূর্ণ সুর বদলে ফেলেন। মুঠোফোনের কথোপকথন অস্বীকার করার পাশাপাশি উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারটিকে ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

অসহায় পরিবারের আকুতি নিখোঁজ তামিনার দাদী সমিজা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন,
“আমার আদরের নাতনী সারাক্ষণ আমার সাথে থাকতো। ২৬ দিন ধরে ও নাই। ফজলার মাস্টার ১০ দিন পর মোবাইলে ফোন করে ওর খবর দেয়, সাথে অনেক খারাপ কথাও বলে। নাতনীকে ফিরে পাওয়ার জন্য আমি টাকা-পয়সা যা লাগে দিতে চেয়েছি, কিন্তু এখন সে সব অস্বীকার করে আমাদের হুমকি দিচ্ছে। আমি শুধু আমার নাতনীকে ফেরত চাই।”

কান্না থামছে না মা রুনা বেগমেরও। ক্ষোভ আর আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন,”আমরা গরীব মানুষ বলে কি বিচার পাব না? হেডমাস্টার প্রথমে বলল মেয়ে তার কাছে আছে, আবার নানা নোংরা কথা বলল। এখন থানায় জানিয়েও কোনো সুরাহা পাচ্ছি না। কেউ আমাদের মূল্যায়ন করছে না।”

মেয়ের বাবা আলতাবুর রহমান জানান,মেয়েকে উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও কোনো লাভ হয়নি। উল্টো এখন প্রভাবশালী মহলের পক্ষ থেকে নানা মাধ্যমে তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

প্রধান শিক্ষকের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে প্রধান শিক্ষক ফজলার রহমান দাবি করে তিনি বলেন, যে নম্বর থেকে কল করা হয়েছিল সেটি তার নয়, তার চাচার। তবে অডিও রেকর্ডের কণ্ঠের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি দাবি করেন, কেউ হয়তো তার “কণ্ঠ নকল” করে কথা বলেছে! একই সাথে তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে সামাজিকভাবে ফয়সালার চেষ্টা চলছে।

অতীতেও ছাত্রীদের সাথে অনৈতিক সম্পর্কের যে অভিযোগ তার বিরুদ্ধে রয়েছে, তাও তিনি অস্বীকার করেন।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা সামছুল আলমসহ প্রতিবেশীদের দাবি ভিন্ন। তারা জানান,এই প্রধান শিক্ষকের চরিত্র নিয়ে আগেও নানা বিতর্ক ছিল। একজন শিক্ষকের এমন রহস্যজনক ও আপত্তিকর আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

এত বড় একটি ঘটনা ঘটলেও আইনি প্রক্রিয়ার গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বোদা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সোয়েল রানা জানান, এই বিষয়ে থানায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। তবে কিছুদিন আগে মৌখিক তথ্য পাওয়ার পর সহকারী পরিদর্শক (এসআই) তৌহিদ বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।

২৬ দিন ধরে একটি নাবালিকা মেয়ে নিখোঁজ, যার সাথে জড়িয়ে গেছে একজন প্রধান শিক্ষকের নাম—সেখানে লিখিত অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকে কেন প্রশাসন স্বতঃস্ফূর্তভাবে কঠোর তদন্তে নামছে না? কেন এখনো উদ্ধার করা গেল না তামিনাকে?
একটি অসহায় পরিবার তাদের কন্যাসন্তানকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পেতে এখন স্থানীয় প্রশাসন ও উচ্চপদস্থ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছে।