
জীবনকে সহজ করে দিচ্ছে বিজ্ঞান, পৃথিবীটাই এখন হাতের মুঠোয়। দূরের মানুষের সাথে সহজে কথা বলা জন্য মুঠো ফোন (মোবাইল) বিজ্ঞানের আশ্চর্য্য সৃষ্টি। মোবাইল এখন আর কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। গেমস খেলা, ভিডিও দেখা , ফেসবুকের মাধ্যমে মনের আবেগ প্রকাশ করা , ইউটিউব এর মাধ্যমে নাটক, সিনেমা দেখা, ইমু এর মাধ্যমে দেখে দেখে কথা বলা, বার্তা আদানপ্রদান করা, অফিসের অনেক কাজ এখন মোবাইলে সেরে ফেলা, সবই হচ্ছে মোবাইলে।
মোবাইল যেমন জীবনকে সহজ করে দিয়েছে আবার কঠিনও করেছে, বর্তমান প্রেক্ষাপট চিন্তা করলে মোবাইলের ফলে খারাপের দিকে ঝুঁকে পড়ছে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা। আসক্ত হয়ে পড়ছে মোবাইল ফোনে। আবার মোবাইলের ফলে অনেকে খারাপ ছেলেদের সাথে গড়ে তুলছে বন্ধুত্ব। তাদের সাথে মিশে বিভিন্ন ধরনের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। এতে বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ। তৈরি হচ্ছে কিশোর গ্যাং।
করোনাকালীন সময় বন্ধ রাখতে হয়েছিলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবুও চলেছে ক্লাস। এই ক্লাসগুলো নেওয়া হয়েছিলো অনলাইনে, যার ফলে শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই হাতে পেয়েছে মোবাইল ফোন। অনলাইন ক্লাসের নামে শিশু থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ঝুঁকে পড়ছে মোবাইল আসক্তে। আবার অনেকের পড়াশোনা ছেড়ে বেকার সময় কাটাচ্ছে। এতে মানষিক ভারসাম্যহীনতার মধ্যে পড়ছে তারা। শিক্ষাব্যবস্থাকে একেবারে পঙ্গু করে ফেলেছে করোনা ভাইরাস।
বাসা থেকে বের হলেই দেখা যায় কিশোর, যুবক ছেলেরা দল বেঁধে বাড়ির পাশে বসে সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে খেলা করছে। আবার অনেককে বাজারেও দেখা যায় মোবাইল নিয়ে কি যেন করছে। এমন দৃশ্য চোখে পড়েছে সব জায়গায় ।
করোনার শুরুতে অনলাইনে পড়াশোনার একটু চাপ থাকলেও এখন কিছুই নেই।তবে মোবাইল ঠিকই আছে হাতে। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর নেই পাঠ্য বইয়ের সাথে কোন সম্পর্ক। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সকাল থেকে শুরু করে টানা দুপুর পর্যন্ত মোবাইল নিয়ে মেতে থাকে। বাজারেও ১০/১২ জন করে একসাথে বসে বিভিন্ন গেমস খেলায় মেতে থাকে।আবার দুপুর গড়িয়ে বিকেল পড়তে না পড়তেই শুরু হয়ে যায় একই কাজে।বর্তমানে পাবজি, ফ্রি ফায়ার গেমস, টিকটক এ তারা বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছে।
দেশে করোনার শুরুতে অনলাইনে ক্লাস করার জন্য পরিবারকে চাপ দিয়ে মোবাইল কেনা হলেও বর্তমানে তা আর হচ্ছে না। করোনার শুরুতে অনলাইনে ক্লাস চালু করেছিল অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিন্তু এখন আর তা নাই। প্রায় প্রতিষ্ঠানই অনলাইন ক্লাস বন্ধ করে দিয়েছে।
মোঃ মনির হোসেন নামে ক্ষুদে এক ব্যবসায়ী বলেন প্রতি দিন সকাল ৮টায় দোকানে যাই আর ফিরি রাতে। দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য আসলেও সন্তানদের সাথে তেমন কথা হয় না। বাসায় ছেলেকে ঠিক মতো সময় দিতে পারি না।প্রাইভেট টিউটর আসে। তিনি একটু সময় দেন। সেই সময় ছাড়া আর কোন সময় আমার ছেলে বই ধরে না। সে কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। আবার খেলাধুলার জন্য কোন জায়গাও নেই। একেবারে একগুঁয়ে হয়ে পড়ছে।সারাদিন মোবাইল আর টিভিই যেন ভরসা। রাতে আসার পর ছেলের মা প্রতিদিনই অভিযোগ দেয় সারাদিন নাকি মোবাইল নিয়েই ছেলে পড়ে থাকে। জানিনা এর থেকে কিভাবে মুক্তি পাবো।
এবিষয়ে ডাক্তার মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, একবিংশ শতাব্দীতে যতগুলো সেরা আবিষ্কার রয়েছে তার মাঝে মোবাইল ফোন অন্যতম। দৈনন্দিন জীবনে মোবাইল ফোন ছাড়া চলা প্রায় অসম্ভব তবে মোবাইল ফোনের এত অবদানের পরেও অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার শরীর ও মনের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। মোবাইল ফোন ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন তৈরি করে যা আমাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতি করে থাকে। বড়দের তুলনায় শিশুদের এই ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি কেননা শিশুদের শরীরের গঠন বড়দের তুলনায় অধিক কোমল।
শারীরিক ক্ষতিসূমহ:
মাথা ব্যাথা: দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোন ব্যবহারের ফলে মাথা ব্যাথা হতে পারে।
চোখ জ্বালাপোড়া: একটানা দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে মোবাইল ফোনের পর্দায় তাকিয়ে থাকতে হয় এর ফলে চোখ জ্বালাপোড়া করতে পারে, চোখে ঝাপসা দেখা, চোখ ভারী হয়ে আসা এই সমস্যা গুলোও হতে পারে।
কানের সমস্যা: দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোনে কথা বললে বা কানে এয়ার ফোন বা হেডফোন লাগিয়ে গান শুনলে কানে ব্যাথা বা কানে কম শোনার মত সমস্যা হতে পারে।
ঘাড় ব্যাথা: দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোন ব্যবহার করার সময় আমরা ঘাড় বাঁকিয়ে থাকি যা আমাদের ঘাড় ব্যাথার কারণ হতে পারে।
হাতে ক্লান্তি বোধ : দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোন ব্যবহারের ফলে হাতের মাংস পেশির দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
মানসিক ক্ষতিসূমহ:
ঘুমের সমস্যা: অতিরিক্ত রাত জেগে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ফলে ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়। ঘুমের যে নরমাল প্যাটার্ন সেটা নষ্ট হয়। ঘুম ঠিক মত না হওয়ায় সারাদিন মেজাজ খিটখিটে থাকে, কাজের মনোযোগ নষ্ট হয়, সারাদিন ঘুম ঘুম ভাব থাকে ও ক্লান্তি বোধ হয়।
চিন্তা শক্তি কমে যাওয়া: অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের ফলে মানুষের চিন্তা শক্তি কমে যায়, ফলে নতুন কিছুর উদ্ভাবনও কমে যায় ।
দুশ্চিন্তা: অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার মানুষের দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়ানো গুজব এক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে পারে।
হতাশা: যারা অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন তাদের মাঝে হতাশাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
কাজের মনোযোগ কমে যাওয়া: একটি কাজের মাঝে থাকা অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে ওই কাজের মনোযোগ নষ্ট হয় এবং কাজের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় এমনকি মারাত্মক দুর্ঘটনা পর্যন্ত ঘটে যেতে পারে।
সামাজিক অবক্ষয়: মোবাইল ফোন ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধমূলক কাজ , সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি , পর্নো আসক্তি ইত্যাদি বেড়ে যাচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে সাংবাদিক মোঃ লোকমান হোসেন চৌধুরী (খোকা) বলেন - এ্যান্ড্রয়েড মোবাইলের ফলে ভয়াবহ সাইবার আসক্তির হুমকিতে দেশ , দুধের শিশুরাও মোবাইল ছাড়া খেতে চায় না, অতিরিক্ত অস্থিরতা, আক্রমনাত্বক মনোভাব, প্রচন্ড জেদি হয়ে উঠছে, দৃষ্টিশক্তি অকালে নষ্ট হচ্ছে।
নাসরিন আক্তার ইতি নামে এক শিক্ষিকা বলেন, মোবাইলের কারণে শুধু মস্তিষ্ক মেধা নয় সময় ও নৈতিকতার অবক্ষয় হচ্ছে। বয়স্করা আপনজনের খোঁজ না রেখে, দায়িত্ববোধ ভুলে মোবাইলের নেশায় আসক্ত। বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা বিদ্যালয় হতে ঝড়ে পড়ছে, বাল্য বিবাহ ও মাদকে আসক্ত হচ্ছে। মোবাইল সদ্ব্যবহার বাদ দিয়ে তা অসৎ উদ্দেশ্যের দিকে ঝুঁকে নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ জলাঞ্জলি দিয়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।