
জন্মের মাত্র ২১ দিনের মাথায় মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল ছোট্ট মুসলিমা ইসলাম। দুই বছর না পেরোতেই গুজবের জেরে গণপিটুনিতে প্রাণ হারালেন তার বাবা হান্নান শেখ। ফলে শৈশবেই এতিম হয়ে পড়েছে এই শিশু। এখন তার একমাত্র ভরসা বৃদ্ধ দাদা-দাদী, যাদের চোখে শোক আর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ।
শনিবার (২ মে) বিকেলে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নের সাতৈর গ্রামে নিহত হান্নান শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে আছে পরিবেশ। মানুষের ভিড়ের মাঝেই কিছু না বুঝে কখনো দাদীর কোলে, কখনো অন্যের কোলে ঘুরছে ছোট্ট মুসলিমা। খাচ্ছে না, দুধের ফিডার হাতে নিয়ে তাকিয়ে থাকে, আবার হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, মুসলিমার জন্মের ২১ দিনের মাথায় তার মা আরিফা বেগম স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর থেকে দাদা শাহিদ শেখ ও দাদী নার্গিস বেগমই তাকে লালন-পালন করে আসছিলেন।
শোকে ভেঙে পড়া দাদী বলেন, “মা ২১ দিনেই চলে গেছে, এখন বাবাও নাই। আমার মুসলিমার কেউ রইল না। আমি মরে গেলে এই বাচ্চার কী হবে?”
নিহতের বাবা শাহিদ শেখ বলেন, “আমার ছেলে সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিল। সে যদি অপরাধ করে থাকে, আইনের হাতে তুলে দেওয়া যেত। কিন্তু গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। এখন এই শিশুর ভবিষ্যৎ কী?”
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া এলাকায় একটি ট্রাক দ্রুতগতিতে কয়েকজন পথচারীকে ধাক্কা দেয়—এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে “ট্রাকটি ২০ জনকে চাপা দিয়েছে” এমন গুজব ছড়ালে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
একপর্যায়ে স্থানীয়রা ইট-ব্লক ফেলে সড়ক অবরোধ করে ট্রাকটি থামায়। পরে চালক হান্নান শেখকে নামিয়ে বেধড়ক মারধর করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় ট্রাকের দুই হেলপার নাঈম (২২) ও আল-আমিন (২৫) আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া স্থানীয় অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মাহমুদুল হাসান জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠায়। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পরিবারের দাবি, গুজব ছড়িয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে হান্নানকে। তবে স্থানীয়দের একাংশ বলছেন, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছে।
নিহত হান্নান শেখের পরিবারে রয়েছেন বাবা-মা, দুই ভাই, এক বোন এবং তার দুই বছরের কন্যা মুসলিমা ইসলাম। মা-বাবাহীন এই শিশুটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
এ বিষয়ে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠক সুমন রাফি বলেন, “এই শিশুটির জন্য মানবিক সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। সমাজের সকলের এগিয়ে আসা উচিত।”